ট্রাকের চাপায় এক পরিবারের তিনজন নিহত, শোকে স্তব্ধ পুরো গ্রাম

মাদ্রাসার মাঠজুড়ে মানুষের জমায়েত। মাঝখানে পাশাপাশি রাখা দুটি খাটিয়া। এক শিক্ষক দম্পতির জন্য খাটিয়া দুটি রাখা হয়েছে। মাঠের এক কোণে এ দম্পতি ও তাঁদের সাত মাস বয়সী একমাত্র কন্যা সন্তানের শেষ গোসল দেওয়া হচ্ছিল। খাটিয়াগুলোর চারপাশে তখনো থামছে না স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদ...
মাদ্রাসার মাঠজুড়ে মানুষের জমায়েত। মাঝখানে পাশাপাশি রাখা দুটি খাটিয়া। এক শিক্ষক দম্পতির জন্য খাটিয়া দুটি রাখা হয়েছে।
মাঠের এক কোণে এ দম্পতি ও তাঁদের সাত মাস বয়সী একমাত্র কন্যা সন্তানের শেষ গোসল দেওয়া হচ্ছিল। খাটিয়াগুলোর চারপাশে তখনো থামছে না স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের দীর্ঘশ্বাস। আগের দিনও এই মাঠে তাঁরা হাসি-আনন্দে সময় কাটিয়েছেন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে।
এক দিনের ব্যবধানে সেখানে চলছে শেষবিদায়ের প্রস্তুতি। আজ শনিবার দুপুরে তাঁদের মরদেহ পৌঁছেছে গ্রামের বাড়িতে। বেলা আড়াইটার দিকে জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের এই দৃশ্য দেখে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রতিবেশী ও এলাকার বাসিন্দারা।
.আমাদের পরিবারে তিনজন চলে গেছে। আমার ভাতিজি. জামাতা ও নাতনি। পরিবারে তো আর কেউ থাকল না।
আমরা এটার বিচার চাচ্ছি। আসলে এভাবে রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনা হয়, প্রতিদিন হতেই আছে, প্রতিদিন এভাবে দুর্ঘটনা হচ্ছে। আজ আমাদের বুক খালি হইছে, এভাবে বুক খালি যেন আর কারও না হয়, এটার আমি বিচার চাই।
ইদ্রিস আলী, নিহত ইকরামার চাচা.আজ সকাল ১০টার দিকে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের বুরুঙ্গা এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রাক ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশাকে চাপা দেয়। এতে অটোরিকশায় থাকা মা-বাবা ও তাঁদের একমাত্র সাত মাস বয়সী কন্যাসহ চারজন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ইসলামপুর উপজেলার ইন্দুল্লামারী এলাকার মোরশেদ আলম (২৪), তাঁর স্ত্রী ইকরামা (১৯) ও তাঁদের সাত মাস বয়সী মেয়ে রিফা।
এই দম্পতি মাহমুদপুর হারুনুর রশিদ ইসলামী কমপ্লেক্সের শিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া নিহত মোটরসাইকেল চালকের নাম লিখন আকন্দ (৩২)। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর ঠিকানা জানা যায়নি।
.সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর গড়াতেই মাদ্রাসার মাঠে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ এসেছেন প্রিয় শিক্ষকদের শেষবারের মতো দেখতে, কেউ এসেছেন তাঁদের পরিবারের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা অঝোরে কাঁদছিল।
তাদের অনেকেই কিছুক্ষণ পরপর খাটিয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিল। অন্যদিকে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছিল পরিবেশ। প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর চোখেও ছিল শোকের ছাপ।
যে মাদ্রাসায় প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতেন মোরশেদ ও ইকরামা, সেই মাদ্রাসার মাঠেই পাশাপাশি শায়িত তাঁদের নিথর দেহ। সঙ্গে তাঁদের আট মাসের শিশুকন্যা। এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে কান্না ধরে রাখতে পারছিলেন না উপস্থিত কেউই।
পুরো নয়াপাড়া গ্রাম যেন এক নিমেষে হারিয়ে ফেলেছে তার স্বাভাবিক ছন্দ। .পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোরশেদ আলমের বাড়ি ইসলামপুর উপজেলার সাপধরী ইউনিয়নের ইন্দুল্লামারী গ্রামে। ইকরামাকে বিয়ের পর থেকে শ্বশুরের ওই কমপ্লেক্সের ভেতরেই পরিবার নিয়ে থাকতেন।
আর ওই কমপ্লেক্সে শিক্ষকতা করতেন। গতকাল ওয়াজ মাহফিলে গিয়ে ফিরেছেন সবাই লাশ হয়ে। মোরশেদের পরিবারের লোকজন আসছে।
সবার লাশ তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তাঁদের দাফন করা হবে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ সকালে মেলান্দহের শিমুলতলী এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় জামালপুর শহর থেকে মেলান্দহে যাচ্ছিলেন মোরশেদ আলম, তাঁর স্ত্রী ইকরামা ও তাঁদের সন্তান।
পথে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির একটি ট্রাক প্রথমে একটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেয়। এরপর ট্রাকটি অটোরিকশাটিকে চাপা দিলে সেটি দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে অটোরিকশার যাত্রী একই পরিবারের তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মোটরসাইকেলচালক লিখন আকন্দের মৃত্যু হয়। .মাহমুদপুর হারুনুর রশিদ ইসলামী কমপ্লেক্সের সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইকরামার বাবা-মা এই কমপ্লেক্সের প্রতিষ্ঠাতা। মোরশেদ আলম ও তাঁর স্ত্রী কমপ্লেক্সের ভেতরে থেকেই শিক্ষকতা করতেন।
গতকাল সন্ধ্যার পর তাঁদের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে জামালপুর শহরের একটি ওয়াজ মাহফিলে গিয়েছিলেন। তাঁরা গতকাল রাতে সেখানেই ছিলেন। সকালে সেখান থেকে ফেরার পথে এই ট্রাকচাপায় তাঁদের প্রাণ গেল।
ইকরামার চাচা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আমাদের পরিবারে তিনজন চলে গেছে। '.ট্রাকসহ চালককে আটক করা হয়েছে জানিয়ে জামালপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (মাদারগঞ্জ-মেলান্দহ সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।