ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) সরকারের পতন আসন্ন এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেই তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক। একই সঙ্গে দেশটির কেন্দ্রীয় প্রশাসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে এখন থেকেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার বাণিজ্যিক নগরী কোচিতে আয়োজিত এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। রাজেন্দ্র ময়দানে সিজেপির বিশেষ রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘জন্তর মন্তর অ্যাট কোচি’ শীর্ষক আয়োজনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দীপক সুস্পষ্টভাবে বলেন, গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচনের মাধ্যমেই কেবল কাঙ্ক্ষিত সরকার পরিবর্তন সম্ভব। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনি ব্যবস্থার বিকল্প নেই বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্যকালে অভিজিৎ দীপক অভিযোগ করেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে আড়াল করতে এবং তাকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে বর্তমান বিজেপি সরকার দেশের তরুণ প্রজন্মের বিরুদ্ধে কার্যত প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একজন নির্দিষ্ট আমলা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি ভারতের রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরে জাতীয় তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে প্রবেশের অভিযোগে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কার সঙ্গে নিজের গ্রেপ্তারের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন দীপক। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, দেশের যেখানেই তিনি যাবেন, সেখানেই পূর্ণ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা বহন করবেন। তিনি বলেন, নিজের দেশের তেরঙ্গা পতাকা উঁচিয়ে ধরার তথাকথিত অপরাধে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তার দুই সহযোদ্ধা সৌরভ ও আশুতোষকেও বন্দি করা হয়। স্বাধীন ভারতের বুকে এমন দৃশ্য কেবল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্ধকার দিনগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয় বলে তিনি দাবি করেন।
বর্তমান এনডিএ সরকারের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে তুলনা করে অভিজিৎ দীপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন, কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা একে একে খর্ব করার গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। তাকে আটকের হুমকি প্রসঙ্গে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, তাকে যদি সরকার পুনরায় গ্রেপ্তার করতে চায়, তবে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, কেরালা কিংবা তামিলনাড়ু—ভারতের যেকোনো প্রান্ত থেকেই তা করা হোক। বারবার গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি ফিরে এসে জাতীয় পতাকা তুলে ধরবেন বলে জানান।
সমাবেশে দীপক আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার পর্যায়ক্রমে নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ শুরু করেছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে প্রেম, ভালোবাসা ও বিয়ের মতো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করার পর এখন ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তার দাবি অনুযায়ী, লোকসভা ও বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করতেই বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়াকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ক্ষমতাসীন দল।
ভারতের সাংবিধানিক ভিত্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ড. বি আর আম্বেদকর, মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরুর অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মিত হয়েছিল। অথচ গত এক দশক ধরে এক ভীতি প্রদর্শনকারী পরিবেশ তৈরি করে দেশকে কার্যত নীরব করে রাখা হয়েছিল। তবে দিল্লির জন্তর মন্তর থেকে শুরু হওয়া এই চলমান প্রতিবাদ কর্মসূচি সাধারণ মানুষকে আবারও কথা বলার সাহস জুগিয়েছে এবং রাজপথে প্রতিবাদের শক্তি সঞ্চার করেছে।
তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি দমন-পীড়নের কঠোর সমালোচনা করে দীপক বলেন, তরুণ প্রজন্ম যখনই ক্ষমতাসীনদের নীতি ও অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, তখনই তাদের রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে নিশানা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক ও নির্বাচনি ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীনরা সারা দেশে সুপরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা উসকে দিচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। রাজেন্দ্র ময়দানে আয়োজিত এই রাজনৈতিক সমাবেশে তরুণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাসহ বিপুলসংখ্যক সাধারণ নাগরিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন এবং নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে প্রতিবাদ ব্যক্ত করেন।



এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!