হামে বড় ছেলের মৃত্যু, ছোট ছেলে লাইফ সাপোর্টে, হাসপাতালে দিশাহারা বাবা

গত বৃহস্পতিবার রাতেও বাবার ডাকে সাড়া দিয়েছিল ১০ বছরের নূর মোহাম্মদ আরাফাত। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) শুয়ে জানিয়েছিল, সে ভালো আছে। পরদিন শুক্রবার তার আর কোনো সাড়া মেলেনি। হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় আরাফাতের। গতকাল সন্ধ্যায় ছেলেকে কবর...
গত বৃহস্পতিবার রাতেও বাবার ডাকে সাড়া দিয়েছিল ১০ বছরের নূর মোহাম্মদ আরাফাত। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) শুয়ে জানিয়েছিল, সে ভালো আছে। পরদিন শুক্রবার তার আর কোনো সাড়া মেলেনি।
হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় আরাফাতের। গতকাল সন্ধ্যায় ছেলেকে কবরে শুইয়ে আবারও হাসপাতালে ছুটে আসেন বাবা মোহাম্মদ কবির। ছেলে আরাফাতের জন্য যেন শোক করারও অবকাশ নেই তাঁর।
কারণ, ১০ মাস বয়সী তাঁর আরেক ছেলে হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে। সেও ওই তিন রোগে আক্রান্ত। এক ছেলেকে দাফন করে আরেক ছেলেকে বাঁচানোর অপেক্ষায় এখন কবির।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ছোট ছেলে মোহাম্মদ আবু বক্কর ওরফে আরবের শয্যাপাশে কাটছে তাঁর সময়। চিকিৎসকেরা শিশুটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানিয়েছেন তাঁকে। তবু আশা ছাড়তে পারছেন না এই বাবা।
.আজ শনিবার বিকেলে কথা হয় মোহাম্মদ কবিরের সঙ্গে। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। কখনো বড় ছেলের মৃত্যুর সময় মনে করতে পারছিলেন না, কখনো হাসপাতালে কত দিন ছিলেন, সেই হিসাবও গুলিয়ে ফেলছিলেন।
একপর্যায়ে বললেন, ‘আমার আসলে খেয়াল আসতেছে না। আমার মাথা ঠিক নাই তো। ’.এক ছেলেকে দাফন করে আরেক ছেলেকে বাঁচানোর অপেক্ষায় এখন কবির।
.৩১ বছর বয়সী এই বাবার সংসারে এখন শুধুই বিপর্যয়। বড় ছেলের মৃত্যুতে স্ত্রী আমেনা বেগম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। বাসায় বারবার ছেলেকে খুঁজছেন।
অন্যদিকে ছোট ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন কবির। পাশে আছেন তাঁর বৃদ্ধা মা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসার বিপুল খরচ আর ঋণের বোঝা।
.আরাফাত চট্টগ্রাম নগরের হিলভিউ পাবলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পড়ালেখায় ভালো ছিল সে। দুই ভাইয়ের মধ্যে আরাফাত বড়।
ছোট ভাই আবু বক্করের বয়স মাত্র ১০ মাস। দুই ছেলেকে ঘিরেই ছিল কবির ও তাঁর স্ত্রী আমেনা বেগমের সংসার। কবির জানান, প্রায় ১৫–২০ দিন আগে আরাফাতের জ্বর, বমি ও কাশি শুরু হয়।
অসুস্থতা বাড়তে থাকলে তাকে প্রথমে চট্টগ্রামের সাউদার্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসা চলে। পরে নেওয়া হয় বেসরকারি ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে।
অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালটির আইসিইউতে রাখতে হয়। .ডাক্তাররা তো বলছে, ওর সম্ভাবনা বেশি একটা নাই। লাইফ সাপোর্টে দিয়ে রাখছে।
—মোহাম্মদ কবির, আরাফাত ও আবু বক্করের বাবা.ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসার পরও আরাফাতের অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। চিকিৎসার বিপুল খরচ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ছেলেকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান কবির।
সেখানেও তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত আরাফাতের ফুসফুসের পাশাপাশি যকৃতেও জটিলতা দেখা দিয়েছিল। .গত বৃহস্পতিবার রাতে শেষবারের মতো ছেলের সঙ্গে কথা হয় কবিরের।
তখনো আরাফাত আইসিইউতে। বাবার ডাক শুনে সাড়া দিয়েছিল সে। শুধু জানিয়েছিল, ভালো আছে।
তবে আইসিইউতে বেশিক্ষণ থাকার অনুমতি ছিল না। তাই ছেলের সঙ্গে বেশি কথা বলতে পারেননি কবির। পরদিন শুক্রবার সকালে ছেলের জন্য ওষুধ আনতে গিয়েছিলেন কবির।
এর মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে আসতে বলেন। কবির বলেন, ‘ডাক্তার আমাকে বলছে, ভাই আপনি তাড়াতাড়ি আসেন।
আর ফিরল না আমার বুকের ধনটা। ’যে ছেলেটি বৃহস্পতিবার রাতেও বাবার ডাকে সাড়া দিয়েছিল, শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকেই কবরে রেখে আসতে হয়েছে কবিরকে। নগরের মোমেনবাগ আবাসিক এলাকাসংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
অথচ বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুযোগও নেই তাঁর। হাসপাতালে যে আরেকটি সন্তান লড়ছে। .বড় ছেলের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ছোট ছেলেকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কবির।
১০ মাস বয়সী আবু বক্করও হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন তিনি। শিশুটি বর্তমানে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। চার দিন আগে তাকেও ভর্তি করা হয় হাসপাতালটিতে।
কবির জানান, ছোট ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় তার ওজন ছিল সাড়ে সাত কেজি। কয়েক দিন ধরে চিকিৎসা চলছে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না।
চিকিৎসকেরা কী বলেছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা তো বলছে, ওর সম্ভাবনা বেশি একটা নাই। ’চিকিৎসকদের কাছ থেকে এমন কথা শোনার পরও ছেলের পাশ ছাড়তে পারছেন না কবির। এখন তাঁর সব আশা ছোট ছেলেকে ঘিরে।
এর মধ্যেই আরেক দুশ্চিন্তা স্ত্রী আমেনা বেগমকে নিয়ে। বড় ছেলের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি। কবির জানান, স্ত্রীকে আজ হাসপাতালে আনেননি।
আগের মতো স্বাভাবিক আচরণ করছেন না। বারবার বড় ছেলেকে খুঁজছেন। এমনকি ছোট ছেলেকেও ঠিকমতো চিনতে পারছেন না।
বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন। .‘আমার সোনার টুকরো ছেলেটিকে কেড়ে নিল, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব’.মোহাম্মদ কবিরের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। চট্টগ্রাম নগরের হিলভিউ এলাকার ১ নম্বর সড়কে ভাড়া বাসায় থাকেন তাঁরা।
একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন তিনি। কবির জানান, মাসে সব মিলিয়ে আয় হয় ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাসাভাড়াই দিতে হয় ছয় হাজার টাকা।
বাকি টাকায় স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতেন। দুই সন্তান একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেই সংসারের হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে। শুধু বড় ছেলে আরাফাতের চিকিৎসায় হাসপাতালেই খরচ হয়েছে আড়াই লাখ টাকার বেশি।
কবির বলেন, ‘আমার থেকে কিছু ছিল। তারপর আমার সহকর্মীরা কিছু দিছে। আশপাশের মানুষ আমাকে কিছু দিয়ে হেল্প করছে।
’আত্মীয়ের কাছ থেকেও টাকা ধার করতে হয়েছে তাঁকে। তবে সব মিলিয়ে কত টাকা ঋণ হয়েছে, সেই হিসাব এখনো জানেন না কবির। সামনে আরও কত টাকা লাগবে, সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তায় তিনি।






মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।