স্বপ্নের বিস্তার, সুযোগের বৈষম্য ও সাফল্যের সংজ্ঞা

জেন-জির পৃথিবী বলতে আমরা আসলে কার পৃথিবীর কথা বলি? স্মার্টফোনে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা নগরের তরুণের, নাকি সেই তরুণীর, যাঁর উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের কাছে থেমে যায়? বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীর, বিদেশে ভবিষ্যৎ খোঁজা স্নাতকে...
জেন-জির পৃথিবী বলতে আমরা আসলে কার পৃথিবীর কথা বলি। স্মার্টফোনে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা নগরের তরুণের, নাকি সেই তরুণীর, যাঁর উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের কাছে থেমে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীর, বিদেশে ভবিষ্যৎ খোঁজা স্নাতকের, নাকি অল্প বয়সেই পরিবারের জীবিকার দায় নেওয়া যুবকের।
তাঁরা একই সময়ে বেড়ে উঠছেন। একই পর্দায় দেখছেন সাফল্য, সম্পদ ও প্রতিষ্ঠার গল্প, সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভাবনার হাতছানি। অথচ সেই সম্ভাবনায় পৌঁছানোর পথ তাঁদের জন্য সমানভাবে খোলা নয়।
এই অসম পৃথিবীকে আমরা একটি নাম দিয়েছি, জেন-জি। কিন্তু এর আড়ালে শ্রেণি, অঞ্চল, শিক্ষা, লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থানের গভীর পার্থক্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার সামর্থ্য অর্জন এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে পরিচিত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটির জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, দক্ষতা, পরিশ্রম ও সুযোগ; দ্বিতীয়টির জন্য কখনো যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারে প্রচার, পরিচিতি বা ক্ষমতার নৈকট্য। এই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জেন-জির পৃথিবীকে নতুন করে দেখা দরকার।
.বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীর, বিদেশে ভবিষ্যৎ খোঁজা স্নাতকের, নাকি অল্প বয়সেই পরিবারের জীবিকার দায় নেওয়া যুবকের। .সমাজতাত্ত্বিক কার্ল মানহাইমের প্রজন্ম-ভাবনা মনে করিয়ে দেয়, একই ঐতিহাসিক সময়ে জন্ম নেওয়া মানেই অভিন্ন অভিজ্ঞতার অধিকারী হওয়া নয়। একই ঘটনা ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মানুষের জীবনে ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সচ্ছল শহুরে পরিবারের তরুণ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসা বা কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণ এবং শ্রমজীবী পরিবারের যুবক একই প্রজন্মের সদস্য। কিন্তু তাঁদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের স্বাধীনতা এক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, ইংরেজিতে সাবলীল কিংবা নগরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে উপস্থিত তরুণদের বক্তব্য বেশি শোনা যায়।
প্রান্তিক অঞ্চল ও শ্রমজীবী পরিবারের অসংখ্য তরুণের জীবন আড়ালে পড়ে থাকে। দৃশ্যমান তরুণদের অভিজ্ঞতাকেই পুরো প্রজন্মের পরিচয় ধরে নিলে এই বৈষম্য বিশ্লেষণ থেকে বাদ পড়ে। .পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ-চিন্তায় কিছু পার্থক্য আমার চোখে পড়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের কাছে বিসিএসসহ নিরাপদ সরকারি চাকরি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা প্রবল। এটি আমার শ্রেণিকক্ষভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপ নয়।
তবে প্রশ্ন ওঠে, একই দেশের শিক্ষিত তরুণদের একাংশ রাষ্ট্রের ভেতরে নিরাপত্তা খোঁজেন, অন্য অংশ রাষ্ট্রের বাইরে সম্ভাবনা দেখেন কেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০২৪ সালের ‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ’ গবেষণায় তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ কমে যাওয়া এবং বিদেশে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য আগ্রহের চিত্র পাওয়া যায়। গবেষণাটি ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের নিয়ে; তাই এর সব ফল শুধু জেন-জির বৈশিষ্ট্য নয়।
.সরকারি চাকরির আকাঙ্ক্ষাকে উচ্চাভিলাষের অভাব কিংবা বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছাকে দেশপ্রেমের ঘাটতি বললে বাস্তবতা ধরা পড়ে না। অনিশ্চিত শ্রমবাজারে তরুণেরা এমন পথ খোঁজেন, যেখানে পরিশ্রমের বিনিময়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সম্ভাবনা দেখতে পান। বাংলাদেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাঁদের সামনে সেই সম্ভাবনা কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে পারছে।
সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুর্দিয়োর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজির ধারণা এখানে প্রাসঙ্গিক। একই মেধার দুই শিক্ষার্থীর একজন ভাষা, প্রযুক্তি, পারিবারিক সম্পদ ও সামাজিক যোগাযোগের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যান; অন্যজনকে সেই সুবিধাগুলো অর্জন করতেই সংগ্রাম করতে হয়। অথচ ডিজিটাল পর্দায় দুজনেই একই সাফল্যের ছবি দেখেন।
.একজন তরুণ বছরের পর বছর গবেষণা করে কিংবা দক্ষতা অর্জন করে সমাজে অবদান রাখতে পারেন, অথচ খুব কম মানুষ তাঁর কাজ সম্পর্কে জানেন। অন্যদিকে উত্তেজক বক্তব্য বা কয়েক মুহূর্তের প্রচার কাউকে রাতারাতি পরিচিত করে তুলতে পারে। .একই সাফল্যের মানদণ্ডে অসম সুযোগের মানুষকে বিচার করলে কাঠামোগত বাধাও ব্যক্তিগত ব্যর্থতা মনে হতে পারে।
একজন তরুণ তখন শুধু প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন না, নিজেকে অযোগ্যও ভাবতে শুরু করেন। সামাজিক বৈষম্য ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সংকটে রূপ নেয়। সমাজের তৈরি সীমাবদ্ধতাকে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা বলে বিশ্বাস করতে শেখে।
.জেন-জির পৃথিবীতে শুধু আকাঙ্ক্ষার পরিসর নয়, সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথও বদলেছে। একজন তরুণ বছরের পর বছর গবেষণা করে কিংবা দক্ষতা অর্জন করে সমাজে অবদান রাখতে পারেন, অথচ খুব কম মানুষ তাঁর কাজ সম্পর্কে জানেন। সমস্যা জনপ্রিয়তা নয়।
জনপ্রিয়তার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান, শিল্প ও নাগরিক উদ্যোগও মানুষের কাছে পৌঁছায়। সংকট তৈরি হয় তখন, যখন পরিচিতিকে গুরুত্বের এবং মনোযোগকে যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। দার্শনিক অ্যাক্সেল হনেথের স্বীকৃতির ধারণা মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শুধু জীবিকা নয়, অন্যের কাছে নিজের অস্তিত্বের মূল্যও খোঁজে।
কিন্তু সমাজ কিসের ভিত্তিতে সেই মূল্য নির্ধারণ করবে, সেটি গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন। .সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য কত মানুষের কাছে পৌঁছেছে, তা সহজেই জানা যায়। বক্তব্যটির সত্যতা কিংবা সামাজিক গুরুত্ব নির্ধারণ কঠিন।
এই মনোযোগের অর্থনীতিতে জ্ঞানের পাশাপাশি বিভ্রান্তি ও উত্তেজনাও ছড়াতে পারে। এর দায় শুধু তরুণদের নয়; রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষও এর অংশ। আমরা তরুণদের জ্ঞান, সততা ও পরিশ্রমের কথা বলি; অথচ সম্পদ, প্রভাবশালী পরিচয় ও ক্ষমতার সান্নিধ্যকে অনেক সময় দ্রুত মর্যাদা অর্জনের পথ হিসেবে গ্রহণ করি।
সমাজ যা শেখায় আর যা পুরস্কৃত করে, তার মধ্যে পার্থক্য থাকলে তরুণেরা কোন পাঠটি গ্রহণ করবেন। .ক্ষমতার প্রদর্শন ও জবাবদিহিমূলক প্রয়োগের পার্থক্য গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য মৌলিক। সমাজ যদি ব্যক্তির দৃশ্যমান শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিকল্প হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে নাগরিকদের কাছেও ক্ষমতার অর্থ বদলে যেতে পারে।
.রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রকাশ তরুণদের নাগরিক কল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে। সম্প্রতি একজন রাজনৈতিক পদাধিকারীর অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে উপস্থিতির ভিডিও নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুমান না করেও প্রশ্ন করা যায়, জননিরাপত্তা কি ব্যক্তির দৃশ্যমান তৎপরতায় নিশ্চিত হয়, নাকি আইনসম্মত প্রক্রিয়া, দক্ষ তদন্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
ক্ষমতার প্রদর্শন ও জবাবদিহিমূলক প্রয়োগের পার্থক্য গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য মৌলিক। .বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান তরুণদের রাজনৈতিক সাহস, সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সামনে এনেছে। কিন্তু আন্দোলনে দৃশ্যমান হওয়া আর রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থায়ী অংশীদার হওয়া এক বিষয় নয়।
প্রতিবাদের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় রূপ দিতে রাজনৈতিক সংগঠন, নীতি প্রণয়ন, মতভিন্নতা সামলানো ও জবাবদিহির অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। সেই সুযোগ না দিয়ে তরুণদের কাছে পরিণত নেতৃত্ব প্রত্যাশা করা প্রাতিষ্ঠানিক আত্মবিরোধিতা। তরুণীদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট।
জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের গবেষণায় রাজনৈতিক দলে প্রবেশ, মনোনয়ন, অর্থনৈতিক সম্পদ, নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সীমাবদ্ধতা উঠে এসেছে। পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে কাউকে উদ্যাপন করা আর পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে তাঁকে অংশীদার করা এক নয়। রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা বাড়লেই ক্ষমতার পুনর্বণ্টন ঘটে না।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতা অর্জন করতে হয় দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও ভুল থেকে শেখার সুযোগের মাধ্যমে। তবে প্রতিবাদের নামে ভয় দেখানো, জনতার আক্রমণ কিংবা মব সহিংসতা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের বিকল্প নয়। কোনো প্রজন্মকে সামগ্রিকভাবে দোষারোপের চেয়ে জরুরি হলো, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোন আচরণকে কার্যকর করে তুলছে এবং কোন আচরণের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করছে।
.প্রশ্ন হলো, আমরা কোন ধরনের মানুষকে সফল বলে প্রতিষ্ঠা করছি। কারণ, গভীর সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন সমাজ নিজেই ভুল আদর্শকে সাফল্যের সংজ্ঞা বানিয়ে ফেলে—আর পরবর্তী প্রজন্ম সেই সংজ্ঞা অনুসরণ করলে আমরা বিস্মিত হই। .জেন-জির পৃথিবী শুধু তাঁদের নিজেদের তৈরি নয়।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বণ্টনের যে ব্যবস্থা তাঁরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন, তার মধ্যেই তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তাঁদের হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম কিংবা পরিবর্তনের অনিবার্য নায়ক, কোনোটিই ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁদের মধ্যে সাহস ও সৃজনশীলতা যেমন আছে, তেমনি আছে অনিশ্চয়তা ও ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা।
তাঁদের সমালোচনা করা যাবে, কিন্তু একই মানদণ্ড সমাজের নিজের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে। জেন-জির পৃথিবী দুটি সম্পর্কিত অসমতা সামনে আনে। প্রথমটি সুযোগের, কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার সামর্থ্য অর্জন করবেন।
দ্বিতীয়টি স্বীকৃতির, সেই কাজ করেও কে সমাজের চোখে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন। আমরা প্রায়ই বলি, তরুণেরা বদলে গেছেন। কিন্তু হয়তো তাঁরা আমাদের সমাজে সফল হওয়ার নিয়মগুলোই মনোযোগ দিয়ে শিখছেন।
তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন তাঁরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন ধরনের মানুষকে সফল বলে প্রতিষ্ঠা করছি।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।