মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের শেষ সপ্তাহান্তে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে চূড়ান্ত প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লক্ষ্যে তিনি ফ্লোরিডা, আইওয়া এবং কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিশাল জনসভা করেছেন, যেগুলোতে তিনি অতীতে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। এই রাজ্যগুলোতে ট্রাম্পের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নির্বাচনের আগ মুহূর্তে রিপাবলিকানরা তাদের শক্ত ঘাঁটিগুলো রক্ষায় কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। নিত্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে ভোটারদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা প্রশমিত করার চেষ্টা করার পাশাপাশি ট্রাম্প তার আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের। তিনি দাবি করেছেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে মার্কিন পরিবারগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে।
নির্বাচনী জনসভাগুলোতে ট্রাম্প তার শাসনামলকে আমেরিকার জন্য একটি 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সমর্থকদের বলেন, ডেমোক্র্যাটরা দেশকে একটি 'অন্ধকার যুগে' ফেলে রেখে গিয়েছিল, কিন্তু তার নেতৃত্বে দেশ দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। তবে বর্তমান বাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যদ্রব্য এবং স্বাস্থ্যসেবার উচ্চমূল্য ট্রাম্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আট মাস আগে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভোটারদের মনোযোগ ভিন্ন দিকে সরাতে ট্রাম্প অভিবাসন এবং বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসছেন। ফ্লোরিডা এবং আইওয়ার জনসভায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেবে, মানুষের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেবে এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে। জনসভায় উপস্থিত সমর্থকরা তার এই বক্তব্যে ব্যাপক হর্ষধ্বনি দিলেও মধ্যপন্থী ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের এই উগ্র বাগ্মিতা নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই কিছুটা অস্বস্তি রয়েছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। ডেমোক্রেটিক হাউজ লিডার হাকিম জেফরিস জানিয়েছেন, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে তার দল প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ দলের শীর্ষ নেতারাও ভোটারদের শেষ মুহূর্তের আহ্বান জানাচ্ছেন। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি পূর্বাভাস টুল অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদ জয়ের সম্ভাবনা ৯৬ শতাংশ এবং সিনেট জয়ের সম্ভাবনা ৭৬ শতাংশ। এনবিসি নিউজের একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৫২ শতাংশ ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দেখতে চান, যেখানে রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন ৪৫ শতাংশ ভোটার। এই জরিপ ডেমোক্র্যাটদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও অতীতের নির্বাচনগুলোতে অনেক সময় জরিপের ফলাফল ভুল প্রমাণিত হতে দেখা গেছে।
নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে একটি নাটকীয় মোড় দেখা গেছে। ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্স, যিনি ডেমোক্রেটিক সিনেট মনোনয়ন দৌড়ে আব্দুল আল-সায়েদের কাছে হেরেছিলেন, তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দিয়েছেন। তার এই পদক্ষেপ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ব্যাপক নিন্দার ঝড় তুললেও ট্রাম্প একে 'সাহসী পদক্ষেপ' বলে প্রশংসা করেছেন। এদিকে আলাস্কায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীর পরাজয়ের আশঙ্কায় ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের একটি প্রচেষ্টা আদালত খারিজ করে দিয়েছে। সেখানে একই নামের দুজন প্রার্থী ব্যালটে থাকায় তৈরি হওয়া জটিলতা নিয়ে মামলাটি করা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বারবার সংশয় প্রকাশ করে আসছেন, যদিও ব্যাপক জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিচার বিভাগ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে তদন্ত শুরু করেছে। এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ট্রাম্পের দুই বছরের মেয়াদের একটি গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, হোয়াইট হাউসে যে দল থাকে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত তাদের আসন সংখ্যা কমে যায়। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। যদি তারা এই নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে ট্রাম্পের জন্য নতুন আইন পাস করা বা নীতি নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তদন্ত শুরু করার ক্ষমতা পাবে এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের ফলাফল সাধারণ আমেরিকানদের দৈনন্দিন জীবন, যেমন গ্যাসের দাম, মুদ্রাস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর নীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!