ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার স্যান্ডার্স, মামদানি ও আল-সাইয়েদ

পরিচয়, বিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক চাপ—কোনোটিই তাদের ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের পাশাপাশি ভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান থেকে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলছেন বার্নি স্যান্ডার্স, জো...
পরিচয়, বিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক চাপ—কোনোটিই তাদের ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের পাশাপাশি ভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান থেকে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলছেন বার্নি স্যান্ডার্স, জোহরান মামদানি ও আবদুল আল-সাইয়েদ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি মানেই যে একক কোনো মতাদর্শ কিংবা একমুখী অবস্থান, তা নয়।
দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন এমন কিছু রাজনীতিক, যারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে সরব। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনজন হলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগান থেকে নির্বাচিত সিনেটর আবদুল আল-সাইয়েদ। তিনজনের জন্ম, বেড়ে ওঠা, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক পথ আলাদা।
কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার, গাজায় যুদ্ধ বন্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল নীতির পরিবর্তনের দাবিতে তাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতায় মিল রয়েছে। পরিচয় নিয়ে সংকোচ না করে এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও নিজেদের অবস্থান প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন তারা। বার্নি স্যান্ডার্স: ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবিতে সরব।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রগতিশীল রাজনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার তিনি। ৮৪ বছর বয়সী বার্নি স্যান্ডার্স যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে সিনেটে ককাস করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বতন্ত্র রাজনীতিক।
গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছেন। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে তিনি সরাসরি বলেন, গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড গণহত্যার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরায়েলের নেতানিয়াহু সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনিদের হত্যাযজ্ঞে নিজেদের সম্পৃক্ততা শেষ করা।
শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি স্যান্ডার্স। ইসরাইলে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধে সিনেটে একাধিকবার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ তিনি প্রায় ৬৫ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের মার্কিন বোমা ইসরাইলের কাছে বিক্রি ঠেকাতে তিনটি প্রস্তাব জমা দেন।
গাজায় যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। জোহরান মামদানি: পরিচয় আড়াল না করে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে। উগান্ডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নিজের পরিচয় ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান প্রকাশ্যেই তুলে ধরেছেন।
৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ২০২৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি নিউইয়র্ক সিটির ১১২তম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র।
রাজনীতিতে তার উত্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান। ছাত্রজীবন থেকেই ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের প্রচারেও ইসরাইলি সামরিক অভিযান, গাজায় মানবিক বিপর্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল নীতির সমালোচনা করেছেন।
মামদানি ইসরাইলকে বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞার পক্ষে থাকা বিডিএস আন্দোলনকে সমর্থন করেন। তার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার দাবি আদায়ে অহিংস আন্দোলন হিসেবে এ ধরনের উদ্যোগ বৈধ। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলার তৃতীয় বার্ষিকীতে দেওয়া বিবৃতিতেও তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরেন।
হামাসের হাতে নিহত ইসরাইলিদের স্মরণ করেন এবং হামাসের হামলাকে যুদ্ধাপরাধ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে গাজায় ইসরাইলি অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে একে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহায়তাকেও তিনি এ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করেন।
তবে তার অবস্থান নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। ইহুদি সংগঠনগুলোর কয়েকটি তার বক্তব্যের সমালোচনা করেছে। বিশেষ করে ৭ অক্টোবরের হামলার বার্ষিকীতে দেওয়া বিবৃতিতে ইহুদিদের অভিজ্ঞতা ও শোক যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ করেছে অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ (এডিএল)।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থী কিছু কর্মীও দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আবদুল আল-সাইয়েদ: মুসলিম পরিচয় নিয়ে রাজনীতির চাপের মুখেও অটল। মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার পথে রয়েছেন। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে নতুন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। ৪২ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন।
২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি সিনেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তার শপথের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটরের অভিষেক ঘটবে। মিশিগানে মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা আল-সাইয়েদ ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেট এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনীতিতে আসার আগে ডেট্রয়েট ও ওয়েইন কাউন্টির জনস্বাস্থ্য বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সহজলভ্য করা, নির্বাচনে বড় অর্থের প্রভাব কমানো এবং ইসরাইলে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি তুলেছিলেন। ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়েও ছিলেন সরব।
ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা ও বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। তার নির্বাচনী প্রচারে ইসরাইলপন্থি লবিগোষ্ঠীর ব্যয় ও প্রভাবও বড় বিতর্ক হয়ে ওঠে। রিপাবলিকান প্রার্থীর পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিনেটর টেড ক্রুজও তাকে আক্রমণ করেন।
তার মুসলিম পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ট্রাম্প তাকে ‘জিহাদি’ বলেও আখ্যা দেন। আল-সাইয়েদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
জয়ের পর দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি শিশুরা যেন নিজেদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে বেড়ে উঠতে পারে এবং মার্কিন করের অর্থে তাদের হত্যা করা না হয়—এ কথা বলা ঘৃণা নয়। এটি ভালোবাসার প্রকাশ। তার এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিনপন্থী রাজনীতির জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
একই দেশের ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান। এই তিনজনের রাজনৈতিক পরিচয় ও কর্মক্ষেত্র এক নয়। স্যান্ডার্স দীর্ঘদিনের সিনেটর, মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র আর এল-সাইয়েদ নতুন নির্বাচিত সিনেটর।
তাদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক কৌশলেও পার্থক্য রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার, গাজায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং মার্কিন অস্ত্র সহায়তার ভূমিকা নিয়ে তাদের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ককে সামনে এনেছে। এখানেই আমেরিকান সমাজের বহুমাত্রিক চরিত্রটি স্পষ্ট হয়।
একই দেশে ট্রাম্পের মতো রাজনীতিক যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন স্যান্ডার্স, মামদানি ও আল-সাইয়েদের মতো ভিন্ন অবস্থানের মানুষ। সেখানে ক্ষমতাসীনদের নীতির সমালোচনা করার, নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রকাশের এবং মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি শুধু ক্ষমতাসীনদের অবস্থানে নয়; বরং ভিন্নমত প্রকাশ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ক্ষমতার সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সুযোগের মধ্যেও নিহিত।
এই তিন রাজনীতিকের কর্মকাণ্ড সেই বাস্তবতারই একটি দৃষ্টান্ত। সূত্র: বার্নি স্যান্ডার্সের সরকারি বিবৃতি, নিউইয়র্ক সিটি মেয়রের সরকারি ওয়েবসাইট, সিবিএস নিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, সিবিএস ডেট্রয়েট ও আল-মনিটর। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।