গেনথিং হাইল্যান্ডের স্মৃতি

কিছু ভ্রমণ থাকে, যা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মন থেকে কখনো নামে না। টিকিটের কাগজ হারিয়ে যায়, ব্যাগের ধুলো ঝেড়ে ফেলা হয়, ছবিগুলো একসময় মোবাইলের গ্যালারির ভিড়ে তলিয়ে যায়; তবু কোনো এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায়, কিংবা ব্যস্ত দিনের ক্লান্তির ফাঁকে হঠাৎ সেই স্মৃতি ফিরে আসে। বুকের...
কিছু ভ্রমণ থাকে, যা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মন থেকে কখনো নামে না। টিকিটের কাগজ হারিয়ে যায়, ব্যাগের ধুলো ঝেড়ে ফেলা হয়, ছবিগুলো একসময় মোবাইলের গ্যালারির ভিড়ে তলিয়ে যায়; তবু কোনো এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায়, কিংবা ব্যস্ত দিনের ক্লান্তির ফাঁকে হঠাৎ সেই স্মৃতি ফিরে আসে। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে, আর মনটা এক নিমেষে ছুটে যায় অনেক দূরে।
মালয়েশিয়ার গেনথিং হাইল্যান্ড আমার কাছে তেমনই এক স্মৃতি, যার কথা ভাবলে আজও শিহরিত হই। এই যাত্রায় আমার পাশে ছিলেন আমার স্ত্রী ও তিন মেয়ে; আর তাদের হাসিমুখই এই স্মৃতিকে আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সঞ্চয়ে পরিণত করেছে। কুয়ালালামপুর থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে পৌঁছালাম পাহাড়ের পাদদেশে।
সেখান থেকেই শুরু হলো আসল যাত্রা। কেব্ল কারের কাচঘেরা ক্যাবিনে বসে মনে হলো, আমি যেন অন্য কোনো জগতের টিকিট কেটেছি। ক্যাবিন ধীরে ধীরে মাটি ছাড়ল।
নিচে ঘন সবুজ বৃষ্টিবনের ঢেউ, গাছের মাথাগুলো যেন প্রকৃতির বিছিয়ে দেওয়া সবুজ মখমলের চাদর। ক্যাবিন যত ওপরে উঠছিল, বুকের ভেতরটা তত হালকা হয়ে আসছিল, যেন বহুদিনের জমানো ভার একটু একটু করে নিচে খসে পড়ছে। তারপর হঠাৎ এলো মেঘ—সাদা, নরম, নিঃশব্দ।
এক মুহূর্তে চারপাশ ঢেকে গেল। জানালার কাচে জমল ফোঁটা ফোঁটা আর্দ্রতা, যেন আকাশ নিজের হাতে আমার গালে ছুঁয়ে দিল। মেয়েরা তখন বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘বাবা, দেখো, আমরা মেঘের ভেতরে।
’ তাদের সেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ আর চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়া আলো দেখে আমার মনে হলো, এই একটি মুহূর্তের জন্যই বুঝি এত দূরের পথ পাড়ি দেওয়া। সময় যেন থেমে গেল, আর আমরা সবাই ভেসে চললাম এক শুভ্র স্বপ্নের ভেতর দিয়ে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো তাড়া নেই। প্রযুক্তির দিক থেকেও এ এক বিস্ময়।
জানলাম, আওয়ানা স্কাইওয়ে চালু হয়েছে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৬৪২ মিটার, আর যাত্রাপথে প্রায় ৬৩০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করতে হয়। সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিটের মতো।
অথচ সেই ১০ মিনিটে যা দেখেছি, যা অনুভব করেছি, তা ভাষায় বলে শেষ করার নয়। কিছু ক্যাবিনের মেঝে কাচের তৈরি। সেখানে দাঁড়ালে পায়ের নিচে অতল সবুজ, আর বুকের ভেতর একসঙ্গে ভয় ও বিস্ময়ের শিহরন জেগে ওঠে।
মেয়েরা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে ভয়ে-আনন্দে খিলখিল করে হাসছিল, আর আমার স্ত্রী মুগ্ধ চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেই দৃশ্য আমি মনের ক্যামেরায় চিরকালের জন্য বন্দি করে রেখেছি। পাহাড়ের চূড়ায় নতুন এক পৃথিবী।
ওপরে পৌঁছে দেখি, পাহাড়ের মাথায় যেন এক নতুন শহর জেগে আছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭২৫ মিটার উচ্চতায় এই শহরের বাতাসে ঠান্ডার মিষ্টি পরশ। নিচের ভ্যাপসা গরম যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
গায়ে জড়িয়ে নিলাম হালকা জ্যাকেট, আর বুক ভরে নিলাম পাহাড়ি বাতাস। সেই বাতাসে ছিল মেঘের গন্ধ, ভেজা মাটির গন্ধ, আর মুক্তির এক অদ্ভুত স্বাদ। শপিংমল, রেস্তোরাঁ, থিম পার্ক, হোটেল—সবকিছুর ভিড়েও এখানে এক ধরনের স্নিগ্ধতা আছে।
শিশুরা খিলখিল করে হেসে ছুটছে, তরুণরা ছবি তুলছে, দম্পতিরা হাত ধরে হাঁটছে—সবার মুখেই এক অদ্ভুত খুশির ছাপ। আমার তিন মেয়েও সেই আনন্দের স্রোতে মিশে গেল; কখনো এদিক ছুটে যায়, কখনো ওদিকে, আবার কখনো নতুন কিছু দেখে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ায়। তারা এতটাই উপভোগ করছিল যে ক্লান্তির কথা যেন ভুলেই গিয়েছিল।
মেয়েদের এমন নির্মল ও অকৃত্রিম খুশি দেখে আমি বুঝলাম, সন্তানদের মুখের হাসির চেয়ে বড় কোনো পাওয়া বাবার জীবনে নেই। আনন্দ বোধহয় এভাবেই সংক্রামক। কুয়াশা যখন শহরটাকে আলতো করে ঢেকে দেয়, তখন আলোগুলো ঝাপসা হয়ে এক রূপকথার দৃশ্য তৈরি করে।
মনে হয়, ছোটবেলায় শোনা কোনো গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছি, আর আমার মেয়েরা সেই গল্পের ছোট্ট রাজকন্যা। আওয়ানা স্কাইওয়ের মাঝপথে রয়েছে চিন সি স্টেশন। একই টিকিটে সেখানে নেমে চিন সি ক্যাভ টেম্পল ঘুরে দেখা যায়।
সেখানে পা রাখতেই মনে হলো, হইহুল্লোড়ের মাঝখানে হঠাৎ এক শান্ত দ্বীপে এসে পড়েছি। পাহাড়ের গায়ে মন্দির, চারপাশে কুয়াশা আর ধূপের মৃদু গন্ধ; কেউ নীরবে প্রার্থনা করছেন, কেউ শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই নীরবতা এমন গভীর যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়।
সারাক্ষণ কলকল করা মেয়েরাও সেখানে কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। ধর্ম যা-ই হোক, এমন নির্জনতায় মানুষ নিজের ভেতরের কথা শুনতে পায়। আমিও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলাম, জীবনের এত ছুটোছুটির মাঝে কবে শেষবার এভাবে থেমে প্রকৃতির দিকে তাকিয়েছি।
কবে শেষবার নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলেছি। প্রিয় মানুষদের কথা মনে পড়ল, যাদের সময় দেওয়া হয়নি, যাদের বলা হয়নি অনেক কথা; মনটা ভারী হয়ে এলো, আবার একই সঙ্গে হালকাও হলো। পাহাড়ের চূড়ায় একে একে আলো জ্বলে উঠল, যেন আকাশের তারারা নেমে এসেছে মাটিতে।
ফেরার সময় কেব্ল কারে বসে নিচের দিকে তাকালাম। অন্ধকার বনের মাঝে দূরের শহরের আলো ছড়িয়ে থাকা তারার মতো ঝিকমিক করছে। ক্যাবিনের ভেতর সবাই চুপ।
সারা দিনের আনন্দে ক্লান্ত মেয়েরা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে আছে, ঠোঁটের কোণে তখনো লেগে আছে সারা দিনের খুশির রেশ। হয়তো সবাই একই কথা ভাবছিলাম—‘এই দিনটা যদি আরো একটু লম্বা হতো। যদি সময়কে একটু থামিয়ে রাখা যেত।
গেনথিং আমাকে শিখিয়েছে, সৌন্দর্য আসলে কোনো দূরের জিনিস নয়। কখনো কখনো তা অপেক্ষা করে মেঘের ওপারে, শুধু একটু সাহস করে ওপরে ওঠার অপেক্ষায়। আমরা প্রতিদিনের ব্যস্ততায় এত ডুবে থাকি যে মাথার ওপরের আকাশটাই দেখতে ভুলে যাই।
অথচ একটু থামলেই, একটু ওপরে উঠলেই জীবন নতুন করে ধরা দেয়। আর সেই জীবন যখন প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়, তখন তার সৌন্দর্য শতগুণ বেড়ে যায়। সেই মেঘের ভেতর দিয়ে ভেসে যাওয়ার অনুভূতি, আর আমার স্ত্রী ও তিন মেয়ের উজ্জ্বল মুখ আমি কোনোদিন ভুলব না।
যারা প্রকৃতি ভালোবাসেন, যারা জীবনের ক্লান্তিকর ছুটোছুটি থেকে একটু বিরতি চান, তাদের বলব, ‘একবার অন্তত গেনথিং ঘুরে আসুন, সম্ভব হলে পরিবার নিয়ে। হয়তো আপনিও মেঘের ভেতর হারিয়ে গিয়ে খুঁজে পাবেন নিজেকে। • সময় : আওয়ানা স্কাইওয়ে সাধারণত সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলে।
সকালে গেলে ভিড় কম থাকে, আর ভাগ্য ভালো থাকলে মেঘের দৃশ্য আরো স্পষ্ট দেখা যায়। • পোশাক : পাহাড়ে ঠান্ডা ও কুয়াশা থাকে, তাই হালকা জ্যাকেট রাখা ভালো। • টিকিট ও খরচ : টিকিটের দাম সময়ের সঙ্গে বদলায়।
যাওয়ার আগে অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে হালনাগাদ তথ্য দেখে নেওয়া উচিত। • খাবার : মুসলিম পর্যটকদের জন্য হালাল রেস্তোরাঁ আছে। কেনার আগে হালাল সনদ দেখে নেওয়াই নিরাপদ।
• রক্ষণাবেক্ষণ : মাঝে মাঝে আওয়ানা স্কাইওয়ে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকে, তখন অন্য কেব্ল কার চালু থাকে। তাই আগে খোঁজ নিয়ে যাওয়া ভালো। লেখক : প্রধান সম্পাদক, সিলেটপিডিয়া।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।