রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় দেশীয় মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার মহিশালবাড়ি বাজারে পরিচালিত এই ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল এবং ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করা হয়। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার দায়ে দুই জন দোকান মালিককে মোট ১ লাখ ৮ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহানের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
অভিযান সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার সন্ধ্যায় মহিশালবাড়ি বাজারে দুটি দোকানে অতর্কিত হানা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় তল্লাশি চালিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল এবং বর্তমান সময়ের মৎস্য সম্পদের জন্য চরম হুমকি হিসেবে পরিচিত চায়না দুয়ারি জাল উদ্ধার করা হয়। এই জালগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুত করে রাখা হয়েছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় জালের মালিকদের দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাদের আর্থিক জরিমানা করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মহিশালবাড়ি গ্রামের মৃত সৈবুর আলীর ছেলে মোখলেছুর রহমানকে (৬০) ৮ হাজার টাকা এবং একই গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে রফিকুল ইসলামকে (৪৪) ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রফিকুল ইসলামের দোকানে অধিক পরিমাণে নিষিদ্ধ জালের মজুত পাওয়ায় তাকে বড় অংকের এই জরিমানা করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে জানান যে, জব্দকৃত কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জালগুলোর আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৬ লাখ টাকা। তিনি বলেন, এই ধরনের জাল ব্যবহারের ফলে আমাদের নদ-নদী ও জলাশয়ের ছোট-বড় সব ধরনের মাছ এবং জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চায়না দুয়ারি জাল অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ার কারণে এতে মাছের পোনা থেকে শুরু করে কোনো জলজ প্রাণীই রেহাই পায় না। ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। সরকারিভাবে এসব জালের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জব্দকৃত জালগুলো জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং ভবিষ্যতে কেউ এই ব্যবসায় লিপ্ত না হয়।
প্রশাসন সূত্রে আরও জানানো হয়েছে যে, গোদাগাড়ী এলাকাটি পদ্মা নদী সংলগ্ন হওয়ায় এখানে মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবসা করে আসছিল। এই অভিযানের ফলে ওই এলাকায় অবৈধ জালের কারবারিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ইউএনও ইসরাত জাহান তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছ রক্ষায় প্রশাসনের এই ধরনের কঠোর অবস্থান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। তিনি স্থানীয় মৎস্যজীবী এবং সাধারণ মানুষকে এই ধরনের ক্ষতিকর জাল ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি প্রদান করেন যে, যারা আইন অমান্য করে নিষিদ্ধ জালের ব্যবসা বা ব্যবহার চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, নিয়মিত এই ধরনের তদারকি না থাকলে দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যখন মাছের প্রজনন সময় থাকে, তখন এই চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জব্দকৃত জালগুলো শীঘ্রই একটি নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে আগুনে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হবে। এই অভিযানের মাধ্যমে বাজারে নিষিদ্ধ জালের সরবরাহ বন্ধ করার একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া হয়েছে। গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসন মৎস্য সম্পদ রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!