রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ / সকাল ১১:২৪ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়

আধুনিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের পথে বাধা নয় ইসলাম: মাহাথির মোহাম্মদ

আধুনিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের পথে বাধা নয় ইসলাম: মাহাথির মোহাম্মদ
আধুনিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের পথে বাধা নয় ইসলাম: মাহাথির মোহাম্মদ

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদ আধুনিক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ, ইসলামি সভ্যতা, ধর্মীয় সহাবস্থান, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আধুনিকায়ন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে মুসলিম সমাজের সম্পর্ক নিয়ে বহ...

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদ আধুনিক মুসলিম বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ, ইসলামি সভ্যতা, ধর্মীয় সহাবস্থান, জ্ঞান-বিজ্ঞান, আধুনিকায়ন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে মুসলিম সমাজের সম্পর্ক নিয়ে বহু বক্তব্য দিয়েছেন। এসব বক্তব্যে তিনি ইসলামকে শান্তি, মধ্যপন্থা, নৈতিকতা, জ্ঞানার্জন ও মানবিক অগ্রগতির ধর্ম হিসেবে তুলে ধরেছেন।

একই সঙ্গে মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতা, বিভক্তি, অদক্ষ নেতৃত্ব ও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন। মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক বক্তব্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি ইসলামকে আধুনিকতার প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন না। বরং তার মতে, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা যথাযথভাবে অনুসরণ করা গেলে মুসলিম সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারে।

তার বক্তব্যে ইসলামি ঐতিহ্যের গৌরবের পাশাপাশি মুসলমানদের নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদও রয়েছে। ২০০২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ‘দ্য রোল অব ইসলাম ইন দ্য মডার্ন স্টেট’ শিরোনামে দেওয়া এক ভাষণে মাহাথির বলেন, ইসলাম শান্তি ও মধ্যপন্থার ধর্ম। বর্তমানে ইসলামকে যদি কোথাও শান্তি ও মধ্যপন্থার ধর্ম হিসেবে দেখা না হয়, তার কারণ ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং কিছু মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা ও অপব্যবহার।

তিনি বলেন, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা শান্তি, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব এবং নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষার পক্ষে। ইসলাম আগ্রাসী যুদ্ধ ও নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে সমর্থন করে না। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে যুদ্ধের অনুমতি থাকলেও প্রতিপক্ষ শান্তির প্রস্তাব দিলে মুসলমানদের ইতিবাচকভাবে সাড়া দেওয়া উচিত।

মাহাথিরের বক্তব্যে ইসলামকে সহিংসতার সঙ্গে একাকার করে দেখার প্রবণতার বিরোধিতা স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, কিছু মানুষের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা দিয়ে একটি ধর্মের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না। কোনো ধর্মের অনুসারীদের অপরাধ বা বিচ্যুতিকে সেই ধর্মের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

তার মতে, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অনুসরণ করা হলে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এ বক্তব্যে ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত উপাসনার ধর্ম নয়, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলাম আধুনিকায়ন ও পরিবর্তনের বাধা নয়।

পরদিন ‘আরব নিউজ’ তার বক্তব্যের শিরোনাম করে, ‘ইসলাম ইজ নো ব্যারিয়ার টু চেঞ্জ অ্যান্ড মডার্নাইজেশন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহাথিরের মতে, ইসলাম কোনো দেশকে আধুনিকায়নের পথে বাধা দেয় না। বরং পরিবর্তনকে গ্রহণ, প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা এবং নিজেরাই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।

মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা পরস্পরবিরোধী নয়। একটি সমাজ নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রেখেও প্রযুক্তি, অর্থনীতি, প্রশাসন ও শিক্ষায় অগ্রসর হতে পারে। তার বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, আধুনিকতার নামে ধর্মীয় পরিচয় বিসর্জন দেওয়া যেমন অপরিহার্য নয়, তেমনি ধর্মের নামে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করাও যুক্তিসংগত নয়।

ইসলামি সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান। মাহাথির ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসকে মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। ২০০৩ সালের ১০ জুলাই মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বিশ্ব উলামা সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেন, একসময় ইসলাম ও মুসলমানরা বিশ্বজুড়ে সম্মানিত ছিলেন।

মুসলিম সভ্যতা এমন এক জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতি তৈরি করেছিল, যার প্রভাব অমুসলিম সমাজেও পড়েছিল। তিনি গণিত, বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং অন্যান্য জ্ঞানশাখায় মুসলিম পণ্ডিতদের অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব অগ্রগতি ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কারণ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ প্রথম ওহির নির্দেশ ছিল ‘ইকরা’—পড়ো। মাহাথির এই নির্দেশকে জ্ঞান অর্জন, অধ্যয়ন ও গবেষণার গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে বিশ্বের মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য মুসলিম পণ্ডিতদের দিকে তাকিয়ে থাকত।

গ্রিক, পারস্য, ভারতীয় ও চীনা জ্ঞানভান্ডারের বহু রচনা আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল; মুসলিম পণ্ডিতেরা সেগুলো অধ্যয়ন ও সম্প্রসারণ করেছিলেন। ইউরোপীয় ও ইহুদি পণ্ডিতেরাও এসব জ্ঞানকর্মের নাগাল পেতে আরবি শিখেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এখানে তার মূল বক্তব্য হলো, ইসলামি সভ্যতার উত্থানের পেছনে জ্ঞানচর্চা, অনুবাদ, গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

মুসলমানদের আবারও জ্ঞান উৎপাদনকারী সমাজে পরিণত হতে হবে; কেবল অতীতের গৌরব স্মরণ করে বর্তমানের দুর্বলতা আড়াল করলে চলবে না। মুসলিমদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা ও সাধারণীকরণের বিরোধিতা। ১৯৯৯ সালের ২৫ মে কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং আয়োজিত আন্তধর্মীয় বোঝাপড়াবিষয়ক এক সেমিনারে মাহাথির ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, মুসলিমদের অনেক সময় পশ্চাৎপদ, অসামাজিক, উগ্র, অযৌক্তিক কিংবা সন্ত্রাসপ্রবণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ অল্পসংখ্যক মানুষের অপরাধের দায় পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো অন্যায়। মুসলমানরাও অন্য সব জনগোষ্ঠীর মতো জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে বৈচিত্র্যময় সাধারণ মানুষ।

তাদের সবাইকে একক কোনো ছাঁচে বিচার করা যায় না। তিনি আরো বলেন, অন্য ধর্ম ও জনগোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সাধারণত সংশ্লিষ্ট ধর্মের নামে পরিচিত করা হয় না, অথচ মুসলিম কারও অপরাধ ঘটলে তা প্রায়ই ইসলাম বা মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এ ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড মুসলমানদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে এবং আন্তধর্মীয় সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তার মতে, ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। মুসলিম সমাজকে সেই ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। একই সঙ্গে অমুসলিম সমাজেরও মুসলমানদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা যাচাই করা এবং একপক্ষের অপরাধের দায় অন্য সবার ওপর না চাপানোর দায়িত্ব রয়েছে।

ইসলামি সভ্যতা ও আন্তধর্মীয় সহাবস্থান। ১৯৯৯ সালে এক ভাষণে ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসকে শুধু মুসলিমদের নিজস্ব সাফল্যের ইতিহাস হিসেবে দেখেননি; বরং আন্তধর্মীয় বোঝাপড়া ও সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও এর অবদানের কথা বলেছেন মাহাথির। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতের ইসলামি সভ্যতায় বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের জ্ঞানচর্চা, প্রশাসন, বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।

অথচ সমসাময়িক বিশ্বে মুসলিমদের অনেক সময় অমুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়। এই দূরত্ব কমাতে হলে ইসলামি সভ্যতার সহনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ঐতিহ্যকে সামনে আনতে হবে। মালয়েশিয়ার বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সমাজের অভিজ্ঞতাও তিনি বিভিন্ন বক্তৃতায় তুলে ধরেছেন।

তার বক্তব্য ছিল, মালয়েশিয়ায় ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নাগরিকদের মধ্যে সহযোগিতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব। এখানে মাহাথিরের অবস্থান হলো, ইসলামি পরিচয় বজায় রেখেও বহুধর্মীয় সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করা যায়।

ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্যের অধিকার অস্বীকারের অজুহাত বানানো উচিত নয়। মুসলিম উম্মাহর আত্মসমালোচনা ও পুনর্জাগরণের আহ্বান। ২০০৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য উম্মাহ: রি-এক্সামিনিং অ্যান্ড রিইনভেন্টিং আওয়ারসেলভস ইন দ্য ফেস অব নিউ চ্যালেঞ্জেস’ শিরোনামে মাহাথির একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেন।

সেখানে তিনি মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থা, ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং মুসলমানদের চিন্তাগত পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসলামকে পুনর্বিবেচনা করার আগে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং মহানবী (সা.)-এর প্রচারিত মূল বার্তা বুঝতে হবে। ইসলামের মৌলিক বিষয় পরিবর্তন করা যাবে না; তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাখ্যায় বিচ্যুতি ঘটেছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

মাহাথিরের মতে, ইসলাম একসময় বিভক্ত ও সংঘাতপ্রবণ আরব গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত ও উন্নত সভ্যতায় রূপান্তর করেছিল। সেই ধর্মের অনুসারীরা আজ কেন দুর্বল, বিভক্ত ও নির্ভরশীল—এ প্রশ্ন মুসলমানদের নিজেদেরই করতে হবে। তিনি মুসলিমদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, পারস্পরিক বিরোধ এবং ধর্মের নামে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তার মতে, ধর্মের মৌলিক শিক্ষাকে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার বানালে মুসলিম সমাজের ঐক্য ও অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। মুসলমানদের পুনর্জাগরণ কেবল বাহ্যিক রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন চিন্তা, শিক্ষা, জ্ঞান, প্রশাসন ও সামাজিক আচরণের পরিবর্তন। নিজেদের ভুল ও দুর্বলতা চিহ্নিত না করে শুধু বাইরের শক্তিকে দায়ী করলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি আসবে না।

উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে ইসলামের ক্ষতি। মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক বক্তব্যে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের সমালোচনা একটি ধারাবাহিক বিষয়। ২০০০ সালের ৩ অক্টোবর লন্ডনে মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে এক সভায় ‘দ্য ফিউচার অব মুসলিমস ইন দ্য নিউ সেঞ্চুরি’ শিরোনামে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মুসলিম উম্মাহর উন্নয়নকে এগিয়ে নেয় না; বরং মুসলমানদের জন্য আরও ঘৃণা, সন্দেহ ও দুর্ভোগ তৈরি করে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে বা অমুসলিমদের ওপর নির্বিচার হামলা চালিয়ে ইসলামকে রক্ষা করা যায় না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে মুসলিম দেশগুলো আরও বিচ্ছিন্ন হয় এবং মুসলিম সভ্যতার পুনর্গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। যারা ধর্মের নামে সহিংসতা চালায়, তারা বাস্তবে মুসলিমদের অগ্রগতির পথ কঠিন করে তোলে।

২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর কুয়ালালামপুর সামিটের উদ্বোধনী ভাষণেও তিনি একই বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, কিছু মুসলিমের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ইসলাম ও মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে। যারা নিজেদের জিহাদ পরিচালনাকারী বলে দাবি করে নির্বিচারে সহিংসতা চালায়, তাদের কর্মকাণ্ড ইসলামের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন বাড়াচ্ছে।

তার মতে, মুসলমানদের ক্ষোভ ও হতাশা থাকলেও তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিরপরাধ মানুষ হত্যা বা নির্বিচার সন্ত্রাস চালানো গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উম্মাহর সমস্যার সমাধান হয় না; বরং সমস্যার বিস্তার ঘটে। ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান।

২০১৯ সালের কুয়ালালামপুর সামিটে মাহাথির ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়ার প্রসঙ্গ বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসলাম ও মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদ, অযৌক্তিকতা এবং অসভ্য আচরণের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা বেড়েছে। মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট ও কিছু মানুষের অপরাধের কারণে পুরো ধর্ম ও জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা হচ্ছে।

তবে তিনি শুধু বাইরের বিশ্বকে দায়ী করেননি। তার বক্তব্যে মুসলমানদের নিজেদের আচরণ ও দায়িত্ব সম্পর্কেও সতর্কতা রয়েছে। তিনি বলেন, মুসলিমদের নামে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ইসলাম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করেছে।

তাই ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায় মুসলিমদের নিজেদের কর্মকাণ্ডও সংশোধন করতে হবে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মুসলিম সমাজের আত্মসমালোচনা—দুটিকে তিনি পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখেছেন। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্য ও বিদ্বেষের বিরোধিতা করতে হবে, অন্যদিকে ধর্মের নামে সহিংসতা ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, জ্ঞান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা। মাহাথিরের বক্তব্যে মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বারবার উঠে এসেছে। তাঁর মতে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, জনশক্তি ও বাজার রয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক বিভক্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার কারণে এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি বিনিময়, গবেষণা, শিল্পায়ন ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ইসলামি ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক নৈতিকতা সম্পর্কেও তার বক্তব্য রয়েছে।

তার মতে, ইসলামের ব্যবসায়িক নীতিতে স্বচ্ছতা, সততা ও প্রতারণা পরিহারের নির্দেশনা রয়েছে। মুসলমানরা এসব নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করলে শুধু নিজেদের ব্যবসায়িক সাফল্যই অর্জন করবে না, বরং বিশ্বব্যবসায় নৈতিকতার একটি দৃষ্টান্তও স্থাপন করতে পারবে। ওআইসি বা ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও মাহাথির সমালোচনা করেছেন।

তার মতে, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। ২০২৪ সালে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওআইসির সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বসম্মতির বাধ্যবাধকতা অনেক সময় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সংস্কারের পক্ষে মত দেন।

একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মুসলিম দেশগুলোর অর্থ ও জনশক্তি রয়েছে, কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সেগুলো সমন্বিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। তার মতে, মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সংগঠিত সহযোগিতা ও কার্যকর কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন। ফিলিস্তিন ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার।

মুসলিম বিশ্বের সংকট নিয়ে মাহাথিরের বক্তব্যে ফিলিস্তিন প্রশ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবন, মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত থাকার অধিকার আধুনিক সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতির সঙ্গে এসব ঘোষিত মূল্যবোধের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা নিয়েও সমালোচনা করেন। তার মতে, কয়েকটি দেশের ভেটো ক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

একই সঙ্গে তিনি ওআইসির সংস্কার এবং মুসলিম দেশগুলোর সমন্বিত অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শততম জন্মদিন উপলক্ষে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যে গাজা সংকটকে শুধু মুসলিমদের সমস্যা হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সভ্যতার নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক চিন্তার একাডেমিক মূল্যায়ন। মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক বক্তব্য নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সভেন আলেকজান্ডার শটম্যান ২০১৩ সালে ‘ইসলাম অ্যান্ড ক্রিশ্চিয়ান-মুসলিম রিলেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘গড হেল্পস দোজ হু হেল্প দেমসেলভস: ইসলাম অ্যাকর্ডিং টু মাহাথির মোহাম্মদ’ শীর্ষক গবেষণায় তার ধর্মীয় বক্তব্য বিশ্লেষণ করেন।

গবেষকের মতে, মাহাথিরের ইসলামবিষয়ক চিন্তায় অগ্রগতি, আত্মনির্ভরতা, সহনশীলতা, বহুত্ববাদ এবং বাস্তব জীবনে ধর্মীয় নৈতিকতা প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব রয়েছে। তার বক্তব্যে ইসলামকে এমন এক জীবনদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষকে কর্মপ্রবণ, দায়িত্বশীল ও উন্নয়নমুখী হতে উৎসাহিত করে। তবে গবেষক এটিও উল্লেখ করেছেন যে, মাহাথিরের ধর্মীয় বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।

বিশেষ করে মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসলামপন্থি বিরোধী শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রের বহুজাতিক পরিচয় বজায় রাখার প্রয়োজন তার ইসলামবিষয়ক অবস্থানকে প্রভাবিত করেছে। ফলে তার বক্তব্যকে শুধু ধর্মীয় চিন্তা হিসেবে নয়, মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোতেও বুঝতে হবে। ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে মাহাথির মোহাম্মদের ইতিবাচক বক্তব্যের মূল সুর হলো—ইসলাম শান্তি, মধ্যপন্থা, জ্ঞানার্জন, নৈতিকতা ও অগ্রগতির ধর্ম; মুসলমানদের দুর্বলতা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার কারণে নয়, বরং শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, ঐক্য, প্রশাসন ও বাস্তব প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণে।

তিনি ইসলামকে আধুনিকতার প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেননি; বরং ধর্মীয় পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার বক্তব্যে মুসলিম সভ্যতার ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতি যেমন রয়েছে, তেমনি মুসলমানদের আত্মসমালোচনা ও নিজেদের পরিবর্তনের আহ্বানও রয়েছে। ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাধারণীকরণের বিরোধিতা করেছেন, আবার ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও নিরপরাধ মানুষ হত্যারও সমালোচনা করেছেন।

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও গবেষণায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মাহাথিরের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—অতীতের গৌরব স্মরণ করাই মুসলিম পুনর্জাগরণের পথ নয়; বরং সেই গৌরবের পেছনে যে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, কর্মনিষ্ঠা, নৈতিকতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামাজিক সংগঠন ছিল, সেগুলো পুনর্গঠন করতে হবে। ইসলামকে অগ্রগতির বাধা নয়, বরং নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের প্রেরণা হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।

সূত্র: আমার দেশ

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

জাতীয়

জাপানে ফের ভূমিকম্প, আগামী কয়েকদিন সতর্ক থাকার পরামর্শ

জাপানের মধ্যাঞ্চলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ২০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আগামী কয়েক দিন আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কায় সতর্...

জাতীয়

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। পুনর্গঠিত কমিটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস স...

জাতীয়

খুলনার বাজারে শীতকালীন সবজি-মাছের দাম চড়া

খুলনার বাজারে শীতকালীন সবজি উঠতে শুরু করেছে। তবে সরবরাহ বাড়লেও মৌসুমি এসব সবজির দাম তুলনামূলক বেশী। স্থিতিশীল আছে মাংসের ও মাছের ব...

জাতীয়

প্রাথমিকের বই ছাপা প্রায় শেষ, মাধ্যমিকে ৭১ শতাংশের বেশি

আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছানোর লক্ষ্য এনসিটিবির। গত দুই শিক্ষাবর্ষের দেরি কাটিয়ে এবার সময়মতো বই সরবরাহ...

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV