অমলকান্তিদের স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে, খোঁয়ারি কেটে যাবে

ইলিয়াস চেয়েছিলেন একটা গল্প বলতে, নিখাদ মুক্তির গল্প। যুদ্ধের গল্প। যে গল্প লিখতে পারলে তাঁর জীবনে কোনো খেদ থাকত না। নিঃসন্দেহে বাংলার ইতিহাসে আরও একটা কালজয়ী সাহিত্য হতো।হিমেল চায় নিখাদ একটা সিনেমা বানাতে। যে সিনেমায় ব্যক্তি-সাহিত্যিক তথা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পুরো জীব...
ইলিয়াস চেয়েছিলেন একটা গল্প বলতে, নিখাদ মুক্তির গল্প। যে গল্প লিখতে পারলে তাঁর জীবনে কোনো খেদ থাকত না। নিঃসন্দেহে বাংলার ইতিহাসে আরও একটা কালজয়ী সাহিত্য হতো।
হিমেল চায় নিখাদ একটা সিনেমা বানাতে। যে সিনেমায় ব্যক্তি-সাহিত্যিক তথা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পুরো জীবন দেখানো হবে। আর্টফিল্ম ঠিকমতো নামাতে পারলে নাম-যশ বাঁধা।
সাজ্জাদ আলী, একাত্তরের সেই যুদ্ধে সব হারিয়ে, চেয়েছিল কিছু একটা করতে। সারা দেশ ঘুরে ঘুরে শহীদদের তালিকা করতে চায়। স্বাক্ষর জোগাড় করছে, নিখুঁত হবে সেই তালিকা।
কিন্তু সবার সব চাওয়া পূর্ণতা পায় কি। তমিজের বাপ, কাৎলাহার বিলের ধারের ওই পাকুড়গাছ, কিংবা সেই পীর আয়েত আলি শাহের পরিবারের পীর, অথবা হিমেলের প্রয়াত বাবা, কিংবা এরা এসে সব চরিত্রকে যে খোঁয়ারির মতো পরিস্থিতিতে ফেলে। হুট করেই ক্যানসার আক্রমণ করে কথাসাহিত্যিক ইলিয়াসকে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে।
‘খোয়াবনামা’র খোয়াব দেখতে দেখতে কখন তাঁর এক পা বিসর্জন দিতে হয়, তিনি টের পান না। অন্যায়ের কাছে আপসহীন তিনি, কিন্তু তাঁকে একটা পুরস্কারের অর্থ মাথা পেতে নিতে হয়। তিনি চাননি এই পুরস্কার।
কিন্তু ক্যানসারের কাছে তাঁকে নতি স্বীকার করতে হলো। সাজ্জাদ, যে তালিকা তৈরির জন্য নববধূর দেখা স্বপ্নে পানি ঢেলে দিয়েছিল, যে মরীচিকার পেছনে প্রায় পঞ্চাশ বছর ছুটে বেড়াল, নিজের স্ত্রী-সন্তানকে একবারের জন্যও মায়া-মমতার চোখে দেখেনি। যে পীরবাড়ির সন্তান সে নিজে, সেই পীরের মাজার আর তার একান্ত কিছু জিনিসে কবজা করেছিল বন্ধু দুলাল।
সে–ও একসময় এমন কিছুর কাছে নতি স্বীকার করল। হিমেলের জীবনে দুইটা জিনিস আছে, পিছুটান বলতে বাবা আর একটা স্বপ্ন। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বাবাকে একলা ফেলে চষে বেড়াল এমন সব জায়গা, যেখানে ছুটেছিল মঞ্জু, যার স্বপ্ন ছিল মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলবে।
আর হিমেলের স্বপ্ন, সেই মানুষটাকে নিয়ে সিনেমা বানাবে। একটা সিনেমা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে। নিকেতন থেকে মহাস্থানগড় এক দিনে চষে বেড়াতেও তার ক্লান্তি নেই।
কিন্তু শেষমেশ যখন এল, ‘ইটস ইউর কল’, তখন কেন সেই স্বপ্নকে মাটিচাপা দিল। ত্রিশ লাখ শহীদের স্বপ্ন ছিল, তাই বলে সাজ্জাদ আলীর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী নাসিমার স্বপ্ন সফল হবে না। কেন পাপের পথ বেছে নিতে হলো অভাগীকে।
যে লক্ষ্যে, স্বপ্নের পেছনে সাজ্জাদ ছুটছে, তা আদৌ শেষ হবে। একদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বন্দুক হাতে মারছে মানুষ, অন্যদিকে ভোরের প্রথম ফোটা কমলা আলোতে মুগ্ধ হচ্ছে। এই মেটাফোরগুলো কী অসাধারণ।
আবার ওই যে দেশ ভাগ আর ইলিয়াসের কেটে ফেলা পা। এই মেটাফোর চিন্তার খোরাক দেয় বটে। ছোট-বড় কত মেটাফোর পুরো বইজুড়ে লেখক লিখেছেন।
ইলিয়াসের সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবীর দেখা হওয়ার অংশটা খুব অদ্ভুত। অদ্ভুত সুন্দর একটা মোহময়ী আবেশ। কার জীবনে দুঃখ-কষ্ট নেই।
কিন্তু চাপা হাসির আড়ালে তা আর বুঝতে দিই কই। ওই যে লেখকের ভাষায়,‘বেঁচে থাকাটা ওই রকম...সারা জীবন ঝাঁকি লাগে, মনে হয় যে পড়ে যাব...কিন্তু তার জন্য ট্রাক থামানো যায় না...’। অসংখ্য চেনা অচেনা সিনেমা, বেশ কিছু স্বনামধন্য লেখক থেকে পরিচালক, অভিনেতাদের নাম এসেছে।
একজন লেখকের উপস্থিতি আছে, কিন্তু নাম নেই। অন্য একটা রিভিউ পড়ে ব্যাপারটা ধরতে পেরেছি। এইটুকু আমার অপারগতা।
অসুস্থ মঞ্জু খুটখুট শব্দে টাইপরাইটারে যে লেখা লিখে যেতে চেয়েছিলেন, কোনোভাবে লেখক সুহান রিজওয়ান কি অল্প কথায় সেই গল্প আমাদের বললেন। কারণ, সে রকম একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় উপন্যাসের এক পর্যায়ে। শুরু থেকেই কেন যেন মনে হচ্ছিল সেই কথা।
পরে এক চরিত্রের ভাবনা আমার নিজের মনেও আবার সেই প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। কলকাতা কিংবা ঢাকায় মঞ্জুর চিকিৎসা, কিংবা পীরের মাজারের সেই অদ্ভুত লোক, হিমেলের জীবনের নানা বাঁক কী সাবলীল ভাষায় গল্পে উঠে এসেছে। মনে হচ্ছিল, উপন্যাস শেষ না হোক।
তুতুল, মঞ্জুর স্ত্রী, তার চরিত্রটা ঠিক শিউলি ফুলের মতো। বইটা পড়তে পড়তে, অক্টোবরের এই সময়ে একটা মিষ্টি গন্ধ আর আবেশ ছড়িয়ে গেছে। সাজ্জাদের তৈরি তালিকাতে সামান্য খাদ ছিল, যার বিনিময়ে সে বাঁচাতে চেয়েছিল এমন কিছু, যাকে সে বছর বছর দেখেও দেখেনি।
যার পাপ নিজ চোখে দেখেও যেন টিনের চশমা পরে ছিল। লোহা আর চুম্বকের আকর্ষণের মতো হিমেলের ইলিয়াসপ্রেম আবেশে জড়িয়ে নিয়েছিল অনীমকে। কিন্তু ওই যে একটা সিস্টেমের ঘোরাটোপে সব বন্দী।
কিছু পেতে গেলে কিছু খোয়াতেই হবে। প্রতিটি চরিত্রের ক্ষেত্রেই খাটে। সে আমি-আপনি, নাসিমা কিংবা মঞ্জু, হিমেল বা অনীম, সাজ্জাদ বা দুলাল কিংবা রাজাকার আব্বাস।
আমাদের দেশ কিংবা এই পৃথিবী, বা ক্ষুদ্র পরিসরে আমাদের জীবনের চিত্র, বায়োস্কোপের মতো এত দ্রুত পরিবর্তন হয়। সেখানে ইলিয়াস কিংবা হিমেল কিংবা সাজ্জাদের জীবনের এত উত্থান-পতন স্বাভাবিক নয় কি। যেমন করে আমাদের দেশের রাজনীতি ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায়, বদলে যায় ইতিহাস।
হিমেল যদি ইলিয়াসকে নিয়ে সিনেমা করতে পারত, নিজেকে হয়তো ‘ইম্পোস্টার’ বলত না। বাবার ব্যর্থ সন্তান হতো না কিংবা ব্যর্থ স্বামী হিসেবেও নিজেকে ভাবত না। হয়তো অস্কারের মঞ্চ তাঁকে ডেকে নিত।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যদি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর উপন্যাস লিখে যেতে পারতেন, হয়তো আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটা দলিল থেকে যেত। না চাইতেও যে পুরস্কার নিতে হয়েছে, যে পরিস্থিতিতে ভালো-মন্দের মধ্যে, মন্দের ভালো গতিতে চিকিৎসা নিতে হয়েছে, সেই আক্ষেপ হয়তো থাকত না। সাজ্জাদ যদি ঠিকঠাক শহীদদের তালিকা তৈরি করতে পারত, হয়তো তার ময়না পাখিকে অবহেলা করেছে, এই আক্ষেপ আরও বেশি করে কুরে খেত।
কিংবা দেশের জন্য কিছু করছে, সেই অহংকার। অসংখ্য মেটাফোরের উপন্যাসের এই বই শেষ করে নিজেই খোঁয়ারিতে আছি। এই ঘোর কবে ভাঙবে জানি না।
বইটা নিয়ে পাতার পর পাতা লেখা যায়। পরাবাস্তব কিছু দৃশ্য এত বেশি জীবন্ত যে নিজে কোন জগতে আছি, তা নিয়ে দ্বিধা হয়। আমার নিজের খুব পছন্দের একটা শব্দ আছে, বিষণ্ন সুন্দর।
বইটার উপমা এর চেয়ে বেশি কী দেব, জানি না। বইটা যদি আরও ৩০০ পাতা বেশি হতো, পড়তে ক্লান্ত হতাম না। টলমল নদীর জলের মতো একটা বই—ভাষার গাঁথুনি, বাক্য কিংবা উপমা—কোনো খাদ নেই।
এই উপন্যাসে লেখক তিনজনের জীবনের দিক সাজিয়েছেন, কিন্তু এ যে বহুমুখী। তুতুল কিংবা নাসিমা অথবা দুলাল, এমনকি একা পাকুড়গাছের দেখা পাওয়া অনীম, অথবা ওই রহস্যময় বুড়ো, যাকে সাজ্জাদ বারবার দেখে, অথবা ডিমেনশিয়া রোগী, তার দিক থেকেও দেখতে পারি। অথবা একজন পাঠক হিসেবে আমি।
বইটার প্রচ্ছদ অন্য রকম। ছোট ছোট বইয়ের ফাঁকে খোয়াব দেখানো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছায়া যে মিশে গেছে সবার সত্তায়। হিমালয় থেকে তৈরি হওয়া সব নদী যেমন মোহনায় মিশে যায়, ঠিক সে রকম আমরা, গল্পের চরিত্রেরা মিশে গেছি অন্য কারও খোঁয়ারিতে।
এ খোঁয়ারি শেষ হওয়ার নয়। এ বই, এ জীবন, প্যারাডক্সের মতো, ঘুরেফিরে সেই শুরু থেকে শেষ, আবার সেই শুরুর জায়গায় এসে জড়ো হচ্ছি সবাই। হিমেলের বসার ঘরে, টিভিতে চলতে থাকা সিনেমায় মুগ্ধ দর্শক আমরা।
হয়তো সিনেমা শেষে আড্ডায় মেতে উঠবে মঞ্জু, সাজ্জাদ, হিমেল, হিমেলের বাবা, আর সেই পীর কিংবা কাৎলাহার বিল সেঁচে উঠে আসা তমিজের বাপ। মেদহীন এই ঝরঝরে বইটা পড়ে বিষণ্নতা চেপে বসেছে। কবিগুরুর মতো বলতে ইচ্ছে করে, শেষ হইয়াও হইল না শেষ।
হয়তো মঞ্জুর উপন্যাস লেখা অধরা থেকে গেছে, কিন্তু হিমেল একদিন বিশ্বকে চেনাবে, ‘আমাদের একজন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন। ’ সাজ্জাদ জানাবে বিশ্বকে আমাদের দেশের এক একজন শহীদের নাম, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা। সাজ্জাদ-নাসিমা সমুদ্রস্নানে গিয়ে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে আসবে।
হয়তো কেউ এই তিন নদীকে আবার মিলিয়ে দেবে। হয়তো অমলকান্তিদের স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে, খোঁয়ারি কেটে যাবে। বই: অন্য কারও খোঁয়ারিলেখক: সুহান রিজওয়ানপ্রচ্ছদ: মেহেদী হাসান নিলয়প্রকাশক: বাতিঘর।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।