শিশুদের মিথ্যা বলার প্রবণতা কেবল অপরাধপ্রবণতা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকে মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত নানা কারণ। সঠিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই আচরণ নিয়ন্ত্রণ না করলে পরবর্তীতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শিশুদের আচরণ গঠন এবং তাদের মানসিক বিকাশের বিষয়টি বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে শিশুরা কেন সত্য গোপন করে বা মিথ্যা বলে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুরা জন্মগতভাবে মিথ্যাবাদী হয় না; বরং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, ভয় কিংবা অনুকরণ থেকে তারা এই পথ বেছে নেয়। অনেক সময় অতিরিক্ত শাস্তির ভয় বা কঠোর শাসনের কারণে শিশুরা সত্য বলতে ভয় পায় এবং শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে মিথ্যার আশ্রয় নেয়।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধি বা এর আগের প্রাথমিক বিকাশ পর্যায়ে শিশুদের কল্পনাশক্তির জগৎ অনেক বিস্তৃত থাকে। কখনো কখনো তারা তাদের কল্পনার গল্পকে বাস্তব হিসেবে উপস্থাপন করে, যাকে অভিভাবকরা অনেক সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা বলে ভুল করেন। এ ছাড়া মনোযোগ আকর্ষণ করার প্রবণতা, অভিভাবকদের অবহেলা কিংবা কোনো বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের তাগিদ থেকেও শিশুরা অনেক সময় অসত্যের সাহায্য নেয়। এই বয়সটাতে তাদের নৈতিক বোধ পুরোপুরি বিকশিত হয় না, ফলে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা তারা সবসময় বিচার করতে পারে না।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় অভিভাবকদের অত্যন্ত সতর্ক ও ধৈর্যশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিশু মনোবিশেষজ্ঞরা। শিশুদের ওপর অতিরিক্ত রাগারাগি বা শারীরিক শাস্তি প্রয়োগ না করে তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করা উচিত। তাদের মধ্যে সত্য বলার সাহস তৈরি করতে হবে এবং সত্য কথা বললে প্রশংসা বা পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিজেদের আচরণেও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, কারণ শিশুরা বড়দের অনুকরণ করেই বেশি শেখে।
পরিশেষে, শিশুর মিথ্যা বলার অভ্যাসকে কেবল একটি অসদাচরণ হিসেবে না দেখে এর মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। পরিবারের ইতিবাচক পরিবেশ, খোলামেলা আলোচনা এবং স্নেহের শাসন পারে শিশুদের এই বদভ্যাস থেকে দূরে রাখতে। একটি সুস্থ ও সুন্দর মানসিকতাসম্পন্ন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে শিশুদের মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করার কোনো বিকল্প নেই, যা আমাদের সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।