আমাদের সমাজে সবকিছুতে অতিরিক্ত ধারণা দেওয়ার বা সবজান্তা হয়ে ওঠার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই মানসিকতা ব্যক্তি সম্পর্কের পাশাপাশি সামগ্রিক সামাজিক যোগাযোগেও গভীর প্রভাব ফেলছে।
মানব সমাজে এমন কিছু মানুষ সবসময়ই দেখা যায়, যারা যেকোনো বিষয়েই নিজেদের সবজান্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে ভালোবাসেন। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক বিশ্লেষণ ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় এই বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রাত্যহিক জীবনে রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি, বিজ্ঞান থেকে বিনোদন—সব বিষয়েই নিশ্চিত জ্ঞান জাহির করার এই প্রবণতা মূলত একধরনের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাবলয় বা অনেক সময় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, এই ধরনের আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকে নিজের অজ্ঞতা ঢাকবার এক অবচেতন প্রয়াস কিংবা সমাজে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা জাহির করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। যখন কেউ সব বিষয়ে নিজের মতামতকে চূড়ান্ত বলে দাবি করেন, তখন তা অনেক সময় অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি কেবল ব্যক্তিগত আলাপচারিতাকেই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার পরিবেশকেও নষ্ট করে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সার্চ ইঞ্জিনের কল্যাণে যেকোনো তথ্য নিমিষেই পাওয়া সম্ভব, যা অনেক সময় আংশিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই 'সবজান্তা' সংস্কৃতির প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান। ফেইসবুক, টুইটার কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোনো গভীর গবেষণা বা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়াই যেকোনো জটিল বিষয়ে তীর্যক ও চটজলদি মন্তব্য করার প্রতিযোগিতা চলছে। এর ফলে সমাজে ভুল তথ্য বা অপতথ্যের বিস্তার ঘটছে খুব দ্রুত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা রোধে প্রয়োজন ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংযত হওয়া এবং শোনার সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া। অন্যের মতামতকে সম্মান জানানোর মানসিকতা না থাকলে যেকোনো সুস্থ সমাজের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, সবজান্তা মনোভাব পরিহার করে প্রজ্ঞাবান ও তথ্যভিত্তিক সমাজ গঠনে আত্মোপলব্ধি অত্যন্ত জরুরি। নিজের জানার পরিধি সীমিত—এই স্বীকারোক্তি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং তা প্রকৃত জ্ঞানার্জনের প্রথম সোপান। গণমাধ্যম ও সচেতন মহলের উচিত এই বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, যাতে সমাজে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও শ্রদ্ধাশীল আলোচনার পরিবেশ বজায় থাকে।