প্রতিষ্ঠার আট দশক পর বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘ এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা সংস্থাটির কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানব অধিকার সুরক্ষার মূল অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করেছিল জাতিসংঘ। দীর্ঘ আট দশক ধরে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসন, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে এই সংস্থাটি। তবে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ভূমিকা এবং এর টিকে থাকা নিয়ে জোরালো বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় সংস্থাটির নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশার জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে বহু দিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত এবং গাজায় চলমান মানবিক সংকটের মতো বড় বড় ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক বিরোধের কারণে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত এই সংস্থাটি আজ পঙ্গু প্রায়। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট এবং সময়োপযোগী সংস্কারের অভাব জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে শ্লথ করে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাতেও জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বজুড়ে বহুত্ববাদী বিশ্বব্যবস্থা যখন চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য এখনো এই সংস্থার দিকেই তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে জাতিসংঘ কেবল একটি বাকসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এর আমূল কাঠামোগত সংস্কারের ওপর। নিরাপত্তা পরিষদের পরিধি বৃদ্ধি, ভেটো ক্ষমতার সংস্কার এবং বিশ্বনেতৃত্বের সদিচ্ছা ছাড়া এই বৈশ্বিক সংস্থার পক্ষে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই, অন্যথায় বিশ্ব আরও গভীর নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হতে পারে।