স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আটজনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও এক হাজার ৬৫ জন নাগরিক।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হঠাৎ করেই হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বিপজ্জনক মাত্রায় রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সাম্প্রতিক বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশজুড়ে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণ নিয়ে আটজন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়সীমার মধ্যে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৬৫ জন মানুষ। এই লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ পরিস্থিতি চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর বয়সীরা এই ভাইরাসের প্রধান শিকারে পরিণত হওয়ায় অভিভাবকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, আক্রান্তদের একটি বড় অংশে হামের ধ্রুপদী উপসর্গের পাশাপাশি তীব্র শ্বাসকষ্ট, উচ্চ জ্বর এবং নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত এই জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, শৈশবে নিয়মিত টিকাদানের আওতায় ঘাটতি কিংবা টিকাদানের হার কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে কমে যাওয়ার কারণে ভাইরাসের এই মারাত্মক পুনরুত্থান ঘটেছে। পাশাপাশি, ঋতু পরিবর্তনজনিত আবহাওয়া এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কারণে সংক্রমণ দ্রুত এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলছে।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ ও রোগতত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালে বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে যাতে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। একইসঙ্গে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, শিশুদের শরীরে হামের লক্ষণ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং রোগীকে সম্পূর্ণ পৃথকীকরণে (আইসোলেশন) রাখতে হবে যাতে পরিবারের অন্য সদস্যরা সংক্রমিত না হন।
হামের এই আকস্মিক প্রাদুর্ভাব দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য খাত এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকরা প্রতিনিয়ত উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, যার ফলে অনেক পরিবারে মানসিক চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য হাসপাতালের ব্যয়বহুল চিকিৎসাভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া, স্কুলগামী শিশুদের মাঝে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ও মানসিক বিকাশকে ব্যাহত করছে।
এই স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে প্রতিটি শিশুকে শতভাগ টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং জরুরি ওষুধ ও ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাব স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব। প্রশাসনিক নজরদারি আরও জোরদার না করলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২৪টিভি লাইভ-এর সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয় যে, হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ কেন বারবার মহামারী আকারে ফিরে আসছে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করে অবিলম্বে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেবল নির্দেশিকা জারি বা খাতা-কলমে পরিসংখ্যান রাখলেই এই সংকট কাটবে না; বরং প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রকে আরও বেশি proactive বা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমেই কেবল এমন মারাত্মক প্রাদুর্ভাবের স্থায়ী প্রতিকার সম্ভব।